ডেইলি বাংলাগ্রাম

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থামল মাইশার জীবন, আর ফেরা হলো না ঘরে

লরির ধাক্কায় বাস উল্টে আইআইইউসি শিক্ষার্থীর মৃত্যু; আহত আরও দুজন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ

সীতাকুণ্ডের কুমিরায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে লরির ধাক্কায় উল্টে যাওয়া বাস; ঘটনাস্থলে ভিড়
সীতাকুণ্ডের কুমিরায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে লরির ধাক্কায় উল্টে যাওয়া বাস; ঘটনাস্থলে ভিড়

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত (২১)। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল আনুমানিক ৯টা ২০ মিনিটে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও দুজন।

মাইশা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বটকাটিয়া এলাকায়। তিনি সাখাওয়াত হোসেন ও সালমা আক্তারের মেয়ে।

যেভাবে দুর্ঘটনা

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ডালাস পেট্রোল পাম্পের বিপরীত পাশে দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোস্তাক খন্দকারের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীসহ তিনজন বাড়ি যাওয়ার জন্য সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় একটি লরি বাসকে ধাক্কা দিলে বাসটি উল্টে তাঁদের ওপর পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওভারটেক করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি লরি ৮ নম্বর রুটের লোকাল বাসকে ধাক্কা দেয়। এরপর বাসটি উল্টে সড়কের পাশে থাকা ব্যক্তিদের চাপা দেয়। তবে দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পুলিশের চূড়ান্ত তদন্তের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। মাইশাকে গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বেলা ১১টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক নুরুল আলম আশেক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আহতদের অবস্থা

আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একটি বিবরণে অপর আহত ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের শিক্ষার্থী বলা হয়েছে। তবে তাঁর পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে প্রাথমিক আরেক বিবরণে আহত দুজনকেই মাইশার সহপাঠী উল্লেখ করে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলা হয়েছে। আহতদের পরিচয় ও সর্বশেষ চিকিৎসাগত অবস্থা নিয়ে তাই আরও নিশ্চিত তথ্য প্রয়োজন।

দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যানবাহনগুলো পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল আলম জানিয়েছেন, দুটি লরি ও বাস থানায় নেওয়া হয়েছে। চালকদের আটক কিংবা মামলা দায়েরের বিষয়ে পাওয়া তথ্যে নিশ্চিত কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

শোক, ক্লাস স্থগিত ও অবরোধ

মাইশার মৃত্যুর খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আলী আজাদী ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক হাসমত আলী হাসপাতালে যান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শোক প্রকাশ করে তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীরা ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরির চালক ও মালিককে গ্রেপ্তার করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, কেডিএস ডিপোর বিরুদ্ধে ওঠা অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগের প্রতিকার, ক্যাম্পাস গেটের দুই পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, নিহতের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং সড়ক পারাপারে নিরাপত্তা জোরদার করা।

বক্তব্যে অমিল

তবে দুর্ঘটনার আগে মাইশা ও অন্যরা কোথায় যাচ্ছিলেন, তা নিয়ে বক্তব্যে অমিল রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তার ভাষ্যে তাঁরা বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। অন্যদিকে ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ইভা বলেছেন, তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনের জন্য আসছিলেন। কিছু প্রাথমিক বিবরণে রাস্তা পারাপারের কথাও এসেছে। এসব বিবরণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া বাকি।

এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং আরও দুজন আহত হওয়ার তথ্য একাধিক সূত্রে পাওয়া গেলেও আহতদের সর্বশেষ অবস্থা, চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অবরোধের পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।