ডেইলি বাংলাগ্রাম

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লিগের সাধারণ সম্পাদক এমদাদ চৌধুরীর যত কুকীর্তি

নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি—জেএফকে বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ ঘিরে যে দুজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা গেছে, তাঁদের একজন নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী।

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লিগের সাধারণ সম্পাদক এমদাদ চৌধুরীর যত কুকীর্তি

১২ অক্টোবর দোহা থেকে জেএফকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ড. ইউনূসকে একদল প্রবাসী বাংলাদেশি স্লোগান ও বিভিন্ন মন্তব্যের মাধ্যমে হেনস্তা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ইমদাদ চৌধুরীসহ কয়েকজনকে তাঁর সামনে দাঁড়াতে দেখা যায়। তখন হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে ইউনূসকে টার্মিনালের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঘটনাটি সামনে আসার পর ইমদাদ চৌধুরীর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলো পর্যালোচনা করেছে 'ডেইলি বাংলাগ্রাম'। এসব সংবাদে রয়েছে দলীয় নেতাকে মারধরের অভিযোগে গ্রেফতার, আরেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ, পদ দেওয়ার প্রলোভনে অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং প্রবাসী আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে দীর্ঘ বিরোধের বিবরণ।

দলীয় পদ ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ

সংবাদে ইমদাদ চৌধুরীর পূর্ণ নাম মো. ইমদাদুর রহমান চৌধুরী। তিনি নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। আমাদের সময়.কমের বরাত অনুযায়ী তাঁর বাবা শাহজাহান চৌধুরী ওরফে টেনু মিয়া ছিলেন যুদ্ধাপরাধী।

ইমদাদ বছরের অধিকাংশ সময় ঢাকায় অবস্থান করতেন। গণভবন ও সচিবালয়ের আশপাশে তাঁকে দেখা যেত এবং এ নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করতেন।

পরে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন দেওয়ানের গাড়ি চালানোর সূত্রে ইমদাদের সঙ্গে অনেক কেন্দ্রীয় নেতার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সুবাদে তিনি রাজনৈতিক পদ পেয়ে যান।

২০১৯: ওয়ালি হোসেনকে মারধরের অভিযোগে গ্রেফতার

২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের একটি রেস্টুরেন্টে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা ওয়ালি হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪৪ বছর।

ওয়ালিকে মারধরের অভিযোগে ইমদাদ চৌধুরী এবং তাঁর ভাই আবু সাঈদ চৌধুরী ওরফে কুটি চৌধুরীকে নিউইয়র্ক পুলিশ গ্রেফতার করে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের—এনওয়াইপিডির মুখপাত্র সোফিয়া ম্যাসনের বরাতে গ্রেফতারের সময় বলা হয় স্থানীয় সময় ২২ সেপ্টেম্বর, রোববার রাত আড়াইটা।

গ্রেফতারের পর তাঁদের স্থানীয় আদালতে নেওয়া হয়। আদালতে হাজিরার শর্তে ইমদাদ পরে জামিন পান বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে। একই ঘটনায় পুলিশ আরও তিনজনকে খুঁজছিল।

এলমহার্স্ট হাসপাতালের চিকিৎসকদের বরাতে সংবাদগুলোতে বলা হয়, ওয়ালির মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছিল। তিনি হাসপাতালে দুই দিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

ওয়ালি হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, একটি শোকসভা শেষে তবারক গ্রহণের সময় ইমদাদসহ কয়েকজন আচমকা তাঁর ওপর হামলা করেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানসহ নেতারা শেখ হাসিনার সফরসূচি নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

পদ দেওয়ার প্রলোভনে অর্থ আদায়ের প্রতিবাদই কি হামলার কারণ?

হামলার পেছনের কারণ হিসেবে ওয়ালি হোসেন তাঁর একটি ফেসবুক পোস্টের কথা বলেছিলেন।

তাঁর বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দাবি ওঠার পর একশ্রেণির লোক পদ-পদবির প্রলোভন দেখিয়ে নগদ অর্থ আদায় করছিলেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে লিখেছিলেন। সেই পোস্টের কারণেই তাঁকে আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পদ দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগসংবলিত পোস্টে ক্ষুব্ধ হয়ে ইমদাদ ও তাঁর লোকজন হামলা করেন বলে ওয়ালি দাবি করেছিলেন।

সাংগঠনিক ব্যবস্থার ঘোষণা, গ্রেফতারের স্থান নিয়ে অসংগতি

ঘটনার পর নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার সফর শেষে ইমদাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাগোনিউজের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য ছিল, সবাই তখন শেখ হাসিনার জাতিসংঘ সফর নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও ইমদাদের কর্মকাণ্ড বরদাশত করার মতো নয়।

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হাজি এনামও বলেছিলেন, তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ব্যস্ত। তবে কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দলীয় ভাবমূর্তি নষ্টের অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে জেএফকে বিমানবন্দরে উপস্থিত হলে ইমদাদ ও তাঁর ভাইকে আটক করা হয়।

আগের বছরও শেখ হাসিনার নিউইয়র্কে অবতরণের ৭২ ঘণ্টা আগে দলীয় কোন্দলের সংঘাতে দুই যুবলীগ নেতা গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁরা পরে খালাস পান।

২০২৪: মহিউদ্দিন দেওয়ানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ

১৩ জুন ২০২৪ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নিউইয়র্কে ইমদাদের বিরুদ্ধে আরেক দলীয় নেতাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আসে। সরবরাহ করা প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, "নিউইয়র্ক আওয়ামী লীগের মাতাল এমদাদের হাতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা লাঞ্ছিত"।

প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, ১১ জুন মধ্যরাতে ইমদাদ মদ্যপ অবস্থায় এসে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিউদ্দিন দেওয়ানকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও লাঞ্ছিত করেন।

সেদিন সন্ধ্যায় নবান্ন রেস্টুরেন্টে সিদ্দিকুর রহমান একটি সভা করেন। প্রতিবেদনে সভায় অংশ নেওয়া কিছু ব্যক্তিকে "অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত" বলা হয় এবং দাবি করা হয়, দলীয় নেত্রীর স্বাক্ষরিত কমিটির কেউ ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন না। এসব বিষয় নিয়ে মহিউদ্দিন দেওয়ানসহ কয়েকজন নেতা আলোচনা করছিলেন বলে সংবাদটি জানায়।

ঠিক তখন ইমদাদ এসে মহিউদ্দিনকে গালাগালি ও লাঞ্ছিত করেন—এমন অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, সিদ্দিকুর রহমান পুরো ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন এবং একপর্যায়ে ইমদাদকে উসকানি দেন। সোসাইটির নেতা আতাউর রহমান সেলিম ইমদাদকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেন বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

মহিউদ্দিন দেওয়ানের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়, নিজের মানসম্মানের কথা ভেবে তিনি গালাগালির জবাব দেননি এবং নিজেকে সামলে নিয়েছিলেন; অন্যথায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারত।

নাম প্রকাশ না করা প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে সংবাদটি আরও দাবি করে, ইমদাদ প্রায় প্রতি রাতে জ্যাকসন হাইটসে কয়েকজনকে নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করতেন এবং তাঁকে কেউ কেউ "বোতল এমদাদ" নামে চিনতেন। এসব বক্তব্য প্রতিবেদনের অভিযোগ হিসেবে এসেছে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত মূল কমিটির একাধিক নেতার বরাতে ইমদাদের মতো ব্যক্তিদের দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও প্রকাশ করা হয়। সরবরাহ করা কপিতে সংবাদমাধ্যমের নাম ও মূল লিংক নেই; প্রকাশের সময় দেওয়া হয়েছে ১৩ জুন ২০২৪, রাত ১০টা ১০ মিনিট।

"যেখানে ইউনূস—সেখানেই প্রতিরোধ", তারেককে নিয়েও কর্মসূচির তথ্য

যুগান্তরের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ইউনূসের নিউইয়র্ক সফর ঘিরে "যেখানে ইউনূস—সেখানেই প্রতিরোধ" কর্মসূচির বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া নেতাদের মধ্যে ইমদাদের নাম রয়েছে।

এছাড়া 'ডেইলি বাংলাগ্রাম' সম্প্রতি নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের "যেখানে তারেক—সেখানেই প্রতিরোধ" কর্মসূচির কথাও রেকর্ড করেছে।

সর্বশেষ: ২০২৬ সালে জেএফকে বিমানবন্দরে ইউনূস হেনস্তা

১২ অক্টোবর ২০২৬ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ইমদাদ চৌধুরীর নাম এসেছে। ২০১৯ সালে যে বিমানবন্দরে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানাতে গিয়ে তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন, সাত বছর পর সেই একই বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে হেনস্তার অভিযোগে তাঁর নাম আবার সামনে এল।

তবে বারবার একই ব্যক্তির আস্ফালন এবং রাজনৈতিক নেতাদের সম্মানহানিকর কর্মসূচির পরও তাঁর বিপক্ষে বাংলাদেশ মিশন এখনো কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি।