ডেইলি বাংলাগ্রাম

মুসলিম নবজাগরণের কবি ফররুখ আহমদের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

'রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?' —এই প্রশ্ন তিনি করেছিলেন জাতির উদ্দেশে। উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, এক রমজানের দিনে, অনাহারে রোজা রাখা অবস্থায়। আজ সোমবার মুসলিম নবজাগরণের কবি ফররুখ আহমদের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী।

মুসলিম নবজাগরণের কবি ফররুখ আহমদ
মুসলিম নবজাগরণের কবি ফররুখ আহমদ

রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?

'রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি?' —এই প্রশ্ন তিনি করেছিলেন জাতির উদ্দেশে। উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গিয়েছিলেন ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, এক রমজানের দিনে, অনাহারে রোজা রাখা অবস্থায়। আজ সোমবার মুসলিম নবজাগরণের কবি ফররুখ আহমদের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী। তবে ফররুখ ছিলেন চিরশাশ্বত। এমনকি জুলাই আন্দোলনেও তরুণরা তাঁর এই লাইনটি বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল।

দুর্ভিক্ষ থেকে উত্থান

১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার শ্রীপুরের মাঝাইল গ্রামে জন্ম। ছয় বছর বয়সে মা রওশন আখতারকে হারান। খুলনা জিলা স্কুল ও কলকাতার রিপন কলেজে পড়েছেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে-র মতো শিক্ষকের কাছে; সত্যজিৎ রায় ছিলেন স্কুলের সহপাঠী। কিন্তু বিএ শেষ করা হয়নি—সংসারের তাগিদে নামতে হয় চাকরিতে।

১৯৪৩-এর মন্বন্তরে কলকাতার রাস্তা

১৯৪৩-এর মন্বন্তরে কলকাতার রাস্তায় পড়ে থাকা লাশ দেখে তিনি লেখেন 'লাশ' কবিতা। সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পাদিত 'আকাল' সংকলনে ছাপা এই কবিতাই তাঁকে প্রথম পরিচিতি দেয়। একই বছর প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'সাত সাগরের মাঝি'—বাংলা কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের এক নতুন সুর, আর সিন্দবাদ, পাঞ্জেরি, হেরার রাজতোরণের প্রতীকে এক পতিত জাতিকে জাগানোর ডাক।

কেন তিনি 'মুসলিম নবজাগরণের কবি'

ফররুখের কাব্যভাষা বুঝতে হলে বুঝতে হবে তাঁর সময়টাকে। পলাশীর পর থেকে বাংলার মুসলমান ক্রমে ক্ষমতা, জমি ও শিক্ষা—তিনটিই হারিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসন আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি কাঠামোয় বাংলার কৃষক-মুসলমান পরিণত হয়েছিল প্রজায়; কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজে, চাকরি-ব্যবসা-সংবাদপত্রে তার জায়গা ছিল প্রান্তে। ১৯২৩ সালে তুরস্কে খেলাফতের অবসান আর দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে মুসলিম বিশ্বের দিশাহীনতা এই হীনমন্যতাকে আরও গভীর করে। এই পটভূমিতেই আল্লামা ইকবালের ভাবশিষ্য ফররুখ নিজের জাতিকে মনে করিয়ে দিতে চাইলেন নবম-দশম শতকের বাগদাদ, কায়রো আর কর্ডোবার কথা—ইউরোপ যেমন গ্রিস-রোমে ফিরে তাকিয়ে রেনেসাঁ ঘটিয়েছিল, তেমনি।

তাই তাঁর কবিতায় মাঝি, জাহাজ, মাস্তুল, সিন্দবাদ, হেরার রাজতোরণ—সবই একটি ঘুমন্ত জাতিকে জাগানোর রূপক। ১৯৪৬ সালে প্রকাশিত 'আজাদ করো পাকিস্তান' কাব্য-পুস্তিকায় তিনি খোলাখুলি দাঁড়ান ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমির পক্ষে। শেখ মুজিবুর রহমান 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে লিখেছেন, তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন অখণ্ড ভারতে মুসলমানের অস্তিত্ব থাকবে না। অর্থাৎ সেই প্রজন্মের তরুণ বাঙালি মুসলমানের প্রায় সবাই পাকিস্তান চেয়েছিলেন—ফররুখ সেই আকাঙ্ক্ষাকে দিয়েছিলেন কাব্যের ভাষা।

দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত ফররুখ আহমদের 'কওমী গান'

দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত যুদ্ধকালীন সতর্কবাণী

প্রতিবাদের কবি

ইসলামি ঐতিহ্যের কবি বলে যাঁরা তাঁকে একপাশে সরিয়ে রাখেন, তাঁরা প্রায়ই ভুলে যান—১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে গুলির প্রতিবাদে রেডিও পাকিস্তানের সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে সহকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন ফররুখ। ১৯৬৬ সালে আইয়ুব খানের হাত থেকে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ নিতে অস্বীকার করেন। 'হায়াতদারাজ খান' ছদ্মনামে পাকিস্তানি শাসকচক্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন অসংখ্য ব্যঙ্গকবিতা।

এর আগে ১৯৬০ সালে পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও 'প্রাইড অব পারফরম্যান্স'। 'নৌফেল ও হাতেম' কাব্যনাট্য, 'মুহূর্তের কবিতা' সনেটগ্রন্থ, শিশুতোষ 'পাখির বাসা', আর সোয়া তিনশ পৃষ্ঠার মহাকাব্য 'হাতেম তা'য়ী'—বৈচিত্র্যে তিনি ছিলেন সমকালীনদের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

শেষ বছরগুলো

স্বাধীনতার পর নেমে আসে বিপর্যয়। ১৯৭২ সালে বেতারের চাকরি হারান। আহমদ ছফা গণকণ্ঠে 'ফররুখ আহমদের কী অপরাধ' শিরোনামে প্রতিবেদন লিখলে তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়, কিন্তু সংসার আর দাঁড়ায়নি। টাকার অভাবে এক ছেলের ডাক্তারি পড়া বন্ধ হয়। চিকিৎসার অভাবে মারা যায় এক মেয়ে। শেষ রমজানে অসুস্থ কবি না খেয়েই রোজা রাখতেন।

মৃত্যুর পর দাফনের জায়গাটুকুও সরকারিভাবে জোটেনি। শেষে কবি বেনজীর আহমদ শাহজাহানপুরে নিজের পারিবারিক গোরস্থানে জায়গা দেন—বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি শুয়ে আছেন সেখানেই।

"যখন শুনেছি আমি মৃত্যু আছে সূর্যেরও, তবে কেন মিছে এই পৃথিবীর অহংকার? নিমেষেই মুছে যায় জীবনের সব আলো, রয়ে যায় শুধু এক অনন্ত অন্ধকার।"

আজও কেন প্রাসঙ্গিক

নজরুলের কলম যখন থেমে গেছে, তখন ফররুখের শুরু। নজরুল নিজেকে ধর্ম-জাতের ঊর্ধ্বে দাঁড় করিয়েছিলেন; ফররুখ নিজ জাতির ক্ষত চোখে আঙুল তুলে দেখিয়েছেন—জাগরণের ডাক দিয়ে। তাঁর রেনেসাঁ মানে পুরনোকে ফিরিয়ে আনা নয়; পুরনো ভিতের ওপর নতুন সময়ের উপযোগী জাগরণ।

ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে দীর্ঘদিন প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় তিনি ছিলেন প্রায় অনুচ্চারিত। অথচ আহমদ ছফার ভাষায়, পাকিস্তান ও ইসলাম নিয়ে লেখেননি এমন কবি তখনকার বাংলায় ছিলেন না বললেই চলে। ফররুখকে বাদ দিলে বাদ পড়ে বাংলা কবিতার একটি গোটা অধ্যায়।

মৃত্যুর ৫২ বছর পর তাঁর সেই প্রশ্নটি তাই এখনো বাতাসে ভাসে—রাত পোহাবার কত দেরি, পাঞ্জেরি?